লেখক: অ্যাডভোকেট মোঃ রেজাউল করিম, ফরিদপুর জজ কোর্ট: বর্তমান সময়ে কিশোর-কিশোরীদের প্রেম ও বিয়ে নিয়ে সমাজে এক নতুন সংকট দৃশ্যমান হচ্ছে। আইন, আবেগ এবং সামাজিক বাস্তবতার এই দ্বন্দ্ব আমাদের পরিবার ও সামাজিক কাঠামোকে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ১৮ বছর নির্ধারিত হয়েছে Child Marriage Restraint Act, 2017 এর মাধ্যমে। এই আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্য হলো মেয়েদের শারীরিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন কথা বলছে। দেখা যাচ্ছে, ১৬-১৭ বছর বয়সেই অনেক কিশোর-কিশোরী প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিয়ের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। অথচ আইনগত বাধার কারণে অভিভাবকরা তাদের বিয়ে দিতে পারছেন না। ফলে অনেক ক্ষেত্রে তারা পরিবারকে অগ্রাহ্য করে পালিয়ে বিয়ে করছে, যা পরিবারে অশান্তি ও সামাজিক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছে।
এই সমস্যার পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতার ফলে নাটক, সিনেমা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন সবার হাতের মুঠোয়। এসব মাধ্যমে প্রেমের সম্পর্ককে যেভাবে উপস্থাপন করা হয়, তা কিশোর-কিশোরীদের মনে গভীর প্রভাব ফেলে। তারা নিজেদেরকে নায়ক-নায়িকার ভূমিকায় কল্পনা করে এবং বাস্তব জীবনের জটিলতা অনুধাবন না করেই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি, অনেক পরিবারে সন্তানদের সাথে খোলামেলা আলোচনার অভাব রয়েছে, যার ফলে তারা তাদের আবেগ ও সিদ্ধান্তগুলো গোপন রাখে। বয়সজনিত অপরিপক্বতাও এখানে একটি বড় ভূমিকা রাখে—এই বয়সে আবেগের প্রাবল্য বেশি থাকলেও বাস্তবতা অনুধাবনের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কেবল আইনের পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ। পরিবারকে আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে এবং সন্তানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা নিজের অনুভূতি সহজে প্রকাশ করতে পারে। শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সম্পর্কের বাস্তবতা সম্পর্কে জীবনমুখী শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একইসাথে গণমাধ্যমকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে প্রেমের পাশাপাশি বাস্তব জীবনের দায়িত্ব ও পরিণতিও তুলে ধরা হয়।
পরিশেষে বলা যায়, বিয়ের বয়স নির্ধারণের আইনের উদ্দেশ্য যথার্থ হলেও, সামাজিক বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে সচেতনতা বৃদ্ধি, পারিবারিক বন্ধন দৃঢ়করণ এবং দায়িত্বশীল সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলাই এই সমস্যার টেকসই সমাধান হতে পারে। আইন একা সমাজ পরিবর্তন করতে পারে না; প্রয়োজন মানুষের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তন।