
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়ুরে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া ওই ভাষণে তিনি যুদ্ধ-সংঘাত পরিহার করে পারস্পরিক সহযোগিতা ও কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর বিশেষ জোর দেন। ভাষণের শুরুতে তিনি স্মরণ করেন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর শহীদদের পাশাপাশি সম্প্রতি জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে জীবন উৎসর্গকারী ও আহতদের। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের পথপরিক্রমা পেরিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে গণতন্ত্রের নতুন পথে এগিয়ে চলেছে বলে বিশ্বমঞ্চে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর পরিবারের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে তিনি জানান, দেশের মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তাঁর পূর্বসূরিরাও অতীতে এই বিশ্বসভায় বক্তব্য রেখেছিলেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বৈশ্বিক কূটনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা।
বর্তমান বিশ্বের নানা সংকট ও অর্থনৈতিক টালমাটাল পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান যে যুদ্ধবিগ্রহের কারণে বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ছে এবং মানবতা হুমকির মুখে পড়ছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর সরবরাহ চেইন ব্যাহত হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন করে তুলেছে। এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি। ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের ন্যায়সংগত দাবির প্রতি বাংলাদেশের জোরালো সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন সরকারপ্রধান। পাশাপাশি, বিশ্বশান্তি বজায় রাখতে সব ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের ওপর চেপে থাকা রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে জাতিসংঘে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ায় দেশের অর্থনীতি, পরিবেশ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ওপর যে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে, সে কথা তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান। এই সমস্যার একমাত্র ও স্থায়ী সমাধান নিহিত রয়েছে বাস্তুচ্যুত মানুষগুলোর নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ নিজ মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনের মধ্যে। যতদিন পর্যন্ত এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সফল না হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জীবনরক্ষার্থে মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। মিয়ানমারের নাগরিকদের ওপর চলা সংকটের স্থায়ী সমাধানে জাতিসংঘের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা কামনা করেন তিনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক ঝুঁকির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান যে কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হলেও দেশটি এর বিরূপ প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তাই জলবায়ু তহবিল গঠন, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য যথাযথ আর্থিক সহায়তা এবং অভিযোজন ক্ষমতা বাড়াতে ধনী রাষ্ট্রগুলোকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। পরিবেশ রক্ষার অংশ হিসেবে আগামী কয়েক বছরে দেশে কোটি কোটি গাছ লাগানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিভিন্ন প্রকল্পের কথা জানান তিনি। দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালুর পাশাপাশি ভবিষ্যতে ইউনিভার্সাল কার্ড প্রবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানান। এছাড়া তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে সরকারের নেওয়া দূরদর্শী পদক্ষেপগুলোর কথা বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন তিনি।
প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল এই যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক উদ্ভাবনের সুফল যেন সমাজের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছায়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতে আরও বড় বৈষম্যের সৃষ্টি না করে, সে বিষয়ে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের সফল উত্তরণ প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে নিরবচ্ছিন্ন প্রযুক্তি হস্তান্তর ও আর্থিক সহায়তা প্রত্যাশা করেন তিনি। পরিশেষে, জাতিসংঘের চলতি অধিবেশনের মূল প্রতিপাদ্যের সঙ্গে মিল রেখে একটি বৈষম্যহীন, শান্তিপূর্ণ এবং মানবকল্যাণমুখী বিশ্ব গড়ে তুলতে সব দেশকে একসঙ্গে কাজ করার উদাত্ত আহ্বান জানান তারেক রহমান।